মাদাগাস্কারে সাইকেলে

পড়ন্ত বিকেলের তির্যক সোনালি রোদে উড়োজাহাজে লাগানো সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। মাদাগাস্কারের বিমানবন্দরটি অনেকটা ভুটানের পারো বিমানবন্দরের মতো মনে হলো। দোচালা টিনের কিংবা টালি দেওয়া বিমানবন্দরের ছাদ। পারোর মতো ছোট নয়, তবে গোছানো ব্যাপারটা আছে। ৫০ ডলারে ভিসা অন অ্যারাইভাল স্টিকার সেটে গেল পাসপোর্টে। খুব কড়াকড়ি নেই। সাইকেল নিয়ে কেন এসেছি, বাতলাতে হলো। যখন টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন সন্ধ্যা।

হোটেলের ট্যাক্সি নিতে হবে। বড়জোর এক ঘণ্টার পথ। ২০ কিলোমিটারের কিছু কম। ৫০ ডলারে মধ্যম মানের হোটেল পাওয়া যায়, এ অর্থে এত সুন্দর হোটেল পাব ধারণা ছিল না।

সাইকেলে প্রথম দিন

আমাদের (সালমা আপা, শামিমা আপা, আমি আর চঞ্চল) সঙ্গী দুটো ট্যান্ডেম। বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই দুই সাইকেলে। আজ গন্তব্য মানদ্রাকা পার্ক। ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। সিকি কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা এবার বাঁয়ে মোড় নিয়ে খাড়া ঢালে উঠে গেছে। রেকি করতে এসে গতকালই বুঝেছিলাম এটা কঠিন পরীক্ষা হবে। তুলনামূলকভাবে কোনো শহরের মধ্যে এমন খাড়া রাস্তা আগে দেখিনি। যানবাহনের মধ্যে ছোট পুরোনো গাড়ি, মোটরসাইকেল, সাইকেল আছে। স্কুলের বাস দেখা গেল বেশ কয়েকটা। রাস্তা আশঙ্কাজনক সরু। অপরদিক থেকে আসা গাড়ির সঙ্গে টক্কর লাগার আশঙ্কা পদে পদে।

আট কিলোমিটার আসতেই দেড় ঘণ্টা। আরও ঘণ্টাখানেক চালিয়ে আম্বানিতসেনা নামের এক জায়গায় বিরতি নেওয়া হলো। এটা খাবার হোটেল। খুব ছিমছাম।

আসার পথে রাস্তার দুধারে বসতি তেমন চোখে পড়েনি। মাঝেমধ্যে ঝুপড়িতে দোকানজাতীয় কিছু একটা। রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে খানিক বাদে আবাদি জমি। বেশির ভাগই জমিতেই সবজিজাতীয় ফসল।

টানা সাইকেল চালালাম। একসঙ্গে শুরু করেও দুই দলের তাল রাখা দায় হয়ে গেল। আমরা এগিয়ে যেতে যেতে একসময় আবার তাদের দৃষ্টিসীমা হারিয়ে ফেললাম। পথ হারানোর ভয় নেই। তাই নিজেরা এগিয়ে গেলাম। সামনে কোনো বসার জায়গা বা দোকান পেলে থামা যাবে।

হঠাৎ লোকালয়। এক সারিতে কয়েকটা পুরোনো বাড়ি। পলেস্তারা খসে খসে গেছে। মলিন হয়েছে টালিগুলো। বিকেলের রোদের উষ্ণতা হারিয়ে গেছে আগেই। ঠান্ডাও লাগছে। এমন ছোট লোকালয় ঠিক আমাদের দেশের মতোই। দিনের বিশেষ কোনো সময় জমজমাট হয়। দু–একটা মানুষের আনাগোনা। আমাদের সাইকেলের প্রতি ঝোঁক সবার। তবে বাংলাদেশের মতো হাত দিয়ে টেপাটিপি করার প্রবণতা দেখা গেল না!

সারা দিন চালানো হলো। সময়টাকে রাত না সন্ধ্যা বলব? আটটা বাজে। আলো আছে। তবে মিহি দানার মতো আবছা হয়ে আসছে ক্রমে। দূরে পাহাড়ের গায়ে ঢলে পড়া সোনালি কিরণে কয়েকটি বাড়ির ছাতে টিভির অ্যানটেনা দেখা যাচ্ছে। আমরা একটা ত্রিবেণী সংগমে বসে আছি। হোটেল আরও দূরে। প্রায় ৯টার সময় রাস্তার সঙ্গে লাগানো গাছগাছালিতে ভরা মানদ্রাকা পার্ক হোটেলটা পাওয়া গেল।

মানদ্রাকা পার্ক থেকে বেজানোজানো

প্রাতরাশ হলো ফরাসি কায়দায়। ন্যাপকিন জড়িয়ে ব্রেড বাটার অমলেট। সঙ্গে ফলের পানীয়। মনোরম পরিবেশ। রাতে একটা কাঠের সেতু টপকে এসেছিলাম। এখন দেখা গেল তার নিচে বহমান খাল। পরিখার মতো।

প্যাডেল দেওয়ার শুরু সকাল সোয়া সাতটায়। সিঁথির মতো সরু নদীটা আমাদের সঙ্গী হলো। বাঁ দিকে বয়ে যাচ্ছে অবিরাম। কলকল শব্দ পাওয়া যায় খানিক পরপর। রাস্তা এখানে দারুণ। ওঠানামা আছে, তবে গাছগাছালিতে ভরা। মন খুলে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা একই সঙ্গে। নিকট দূরত্বে একটা স্থাপনা। মানদ্রাকার মতোই। সঙ্গে নদীও আছে। মরামাঙ্গা নামের শহরে থাকব আমরা আজ। বেলা শেষে পৌঁছে গেলাম রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া হোটেলে।

উত্তরমুখী যাত্রার শেষ দিন

রুটিনমাফিক ভোর ছয়টায় পথে নামলাম। আজ সবচেয়ে কম চালানো হবে। ৩০ কিলোমিটারের নিচে। রাস্তায় চড়াই আছে কয়েকটা। খাড়া। তবে দীর্ঘ নয়। এতে কষ্ট কম হয়। দৈর্ঘ্য লম্বা হলে কষ্ট বাড়তে থাকে। আজ এত কম দূরত্ব হওয়ার কারণ হলো, এর পরের থাকার জায়গা অনেক দূরে। ১০০ কিলোমিটারের আগে কিছু পাওয়া যাবে না। এই রাস্তায় আমরা ১০০ কিলোমিটার চালাতে পারব না। আজকে যেখানে থাকার পরিকল্পনা, সেখান থেকে আগামীকাল প্রায় ৯০ কিলোমিটার পর একটা মোটেল পাওয়া যাবে। তাই আজ নির্ভার দিন। ধীরে–সুস্থে চালিয়ে শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া।

আজ রাস্তা ভারী চমৎকার। দুই সাইকেল একসঙ্গে। কথা বলে বলে যাওয়া যাচ্ছে। হালকা চড়াই। উতরানো যাচ্ছে তালে তালে। মসৃণ পাকা রাস্তা। মাঝেমধ্যে ১৮ চাকার ট্রাক আসছে। এই গাড়ি নিয়ে ভয় কম। গাড়িগুলো এত উঁচু যে চালক দূর থেকে রাস্তার সবকিছুর খেয়াল রাখতে পারেন।

প্রায় এক ঘণ্টার পর বড় একটা নামা ঢালের দেখা মিলল। ১০ শতাংশ গ্রেডিয়েন্টের (ঢালের মাত্রা) চিহ্ন দেওয়া। এর মানে খুব খাড়া ঢাল। এ ধরনের রোড সাইন পাহাড়ি দেশে খুব পরিচিত। চঞ্চলেরা এগিয়ে চোখের পলকে হারিয়ে গেল। সকালে মিষ্টি রোদ হালকা হয়ে যাচ্ছে। দূরের ধূসর মেঘমালা পেঁজা তুলার মতো জড়ো হয়ে কালো রং ধারণ করছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়ে গেলে ঘাম হয় বেশি। কুলকুল করে ঘামের নহর নেমে যাচ্ছে শিরদাঁড়া বেয়ে। আমরা সমতল থেকে উঁচুতে আছি। বৃষ্টির ভাব প্রবল। থামলাম ছবি তোলার জন্য। আজ একটু আয়েশ কিংবা বিলাসিতা যাই বলা হোক, হতেই পারে।

মধ্যবেলার আগেই আজকের যাত্রার ইতি টানা হলো। এখান থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে মাদাগাস্কারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তমাসিনায় চলে গেলাম পরদিন। আরও এক দিন পর পৌঁছালাম মাহাভেলনা। এটি পর্যটন এলাকা। মাহাভেলনা মালাগাছি নাম। ফউলপয়েন্ট নামেও পরিচিত। ইতিহাস বলছে, এই ফউলপয়েন্ট এসেছে ‘ফুল’ নামের এক ব্রিটিশ জাহাজের নামানুসারে। আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত সময়কালে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমের এই শহর দাস কেনাবেচার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সে সময় এখানে এক ফোর্ট তৈরি করা হয়েছিল শত্রুপক্ষের হাত থেকে বাঁচার জন্য। এ ছাড়া মাহাভেলনার উপকূল বিরল প্রজাতির কোরাল রিফ দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত ছিল। এই দুইয়ের কারণে বর্তমানে এই শহরে পর্যটন ভীষণ জনপ্রিয়।


https://www.prothomalo.com/amp/story/feature/holiday/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%87


4 Responses

  1. xoso66 mobile

    Just tried xoso66 mobile on my phone through xoso66apps.com and it’s surprisingly good! Loads quickly and is really user-friendly. Definitely recommend trying it on mobile: xoso66 mobile

  2. 777 slot casino

    I heard about 777 slot casino through a friend, I’ve been having a blast! Awesome games and the support team is always there when you need them. Check it out! 777 slot casino

  3. sv288

    Okay, so everyone’s talking about SV288. Thought I’d see what all the hype’s about. Getting in the game at: sv288

  4. marathonbet

    [7164]Marathonbet | Link Vào Mới Nhất và Casino Trực Tuyến Uy Tín,Marathonbet cung cấp link truy cập mới nhất cùng ứng dụng chính thức tiện lợi. Trải nghiệm sòng bài đẳng cấp với phương thức nạp tiền ví điện tử nhanh chóng. Tham gia ngay visit: marathonbet

Leave a Reply